ঢাকা, ০৬ এপ্রিল রোববার, ২০২৫ || ২২ চৈত্র ১৪৩১
good-food
৬৯৩

জজ বললেন- মরেন নি তো!

বিচারকের বেপরোয়া গাড়ির ধাক্কায় সাংবাদিক আনোয়ার হক আহত

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৩:১৯ ২ এপ্রিল ২০২৫  

একজন জজ-এর 'রং-সাইডে' চলা বেপরোয়া গাড়ির ধাক্কায় আহত হলেন সিনিয়র সাংবাদিক লাইফ টিভি'র এডিটর ইন চিফ, জাতীয় প্রেসক্লাব সদস্য আনোয়ার হক। 

 

গেল মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) রাতের এই ঘটনায় কোনোমতে তিনি প্রাণে বাঁচলেও মারাত্মক আহত হয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ভয়াবহ ট্রমাটাইজ অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন তিনি। 

 

মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯ টার দিকে রাজশাহী মহানগরীর রাজপাড়া থানাধীন পুলিশ লাইন ভেড়িপাড়া মোড়ে এই ঘটনা ঘটে।

 

অসুস্থ বাবার সঙ্গে ঈদের ছুটি কাটাতে রাজশাহী এসেছিলেন তিনি। ঈদের পরদিনই এমন দুর্ঘটনার শিকার হলেন রাজশাহী বিভাগ সাংবাদিক সমিতি-ঢাকা'র প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম ঢাকা'র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আনোয়ার হক।  

 

আরটিভি নিউজ'র সাবেক চিফ নিউজ এডিটর ও সময় টিভির সাবেক হেড অব ডিজিটাল আনোয়ার হক জানান, সাহেব বাজারের রাজশাহী প্রেসক্লাব থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা যোগে কোর্ট স্টেশন এলাকায় বাসায় ফিরছিলেন তিনি।

 

রিকশাটি ভেড়িপাড়া মোড় অতিক্রম করার সময় বিপরীত দিক থেকে বেপরোয়া গতিতে আসা একজন জজের বড় আকারের হায়েস মাইক্রোবাসটি (ঢাকা মেট্রো - চ ১৯ - ৪৬৮২ ) সজোরে ধাক্কা দেয়। মাইক্রোবাসটি একটি যাত্রীবাহী বাসকে ওভারটেক করে গতি না কমিয়েই দ্রুত রাস্তার ডানপাশে রং-সাইডে চলে আসে।    

 

এতে সাংবাদিক আনোয়ার হক রাস্তার ডানপাশে ছিটকে পড়েন।  তিনি ঘাড়, মাথা, বুক, হাত, কোমর, পা-সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হন।

 

এই ঘটনায় তরুণ বয়সের রিকশাচালকটি মারাত্মক আহত হন। তার রিকশার সামনের অংশ  দুমড়ে-মুচড়ে যায়। আশপাশের লোকজন দৌড়ে এসে তাদের উদ্ধার করে। 


প্রাথমিক সেবা-শুশ্রূষা করেন তারা। এই সুযোগে জজ'কে বহনকারী মাইক্রোবাসটির চালক গাড়িটি নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। উপস্থিত জনগণ তখন গাড়িটি আটকে দেন।

 

প্রতক্ষ্যদর্শীরা জানান,  বিক্ষুব্ধ জনতা মাইক্রোবাস চালককে গাড়িটি রাস্তার একপাশে নিয়ে রেখে গাড়ি থেকে নামতে বললেও তাদের কোন কথাই শুনতে চান নি। উল্টো তিনি উদ্ধত আচরণ করেন। 


এক পর্যায়ে ওই পথ দিয়ে সাদা পোশাকে মোটরসাইকেলযোগে যাচ্ছিলেন রাজপাড়া থানার দুই সদস্য। তারা নিজেদের পরিচয় দিয়ে পুরো ঘটনা শুনে গাড়ি ও রিকশা রাস্তার এক পাশে নেয়ার ব্যবস্থা করেন। কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় পুলিশের একটি টহল দল।


বিক্ষুব্ধ জনগণ তাদের কাছে বিচার দাবি করেন।  পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্দেশ্যে মাইক্রোবাস ও রিকশা থানায় নেয়ার উদ্যোগ নেন এবং জনগণকে সরে যেতে বলেন। 


ঠিক এমন সময় সাদা রঙের পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত এক যুবক চিৎকার করতে করতে ঘটনাস্থলে এসে জনতার মধ্যে ঢুকে পড়েন। উচ্চস্বরে বলতে থাকেন- 'স্যারের গাড়ি কে আটকে রেখেছে? সবাই সরে যান।'


গাড়ির কাছে এসে পুলিশ সদস্যদের তিনি বলেন, 'জানেন ভেতরে কে আছে? জজ স্যারের গাড়ি এটা। ওপর থেকে নির্দেশ এসেছে, এই মুহূর্তে গাড়ি ছাড়ার ব্যবস্থা করেন '।

 

ঘটনাস্থলের পাশের বাসিন্দা  উল্লেখ করে নিজেকে রাজশাহী কোর্টের 'নাজির রানা' বলে পরিচয় দেন ঐ যুবক। জানান, ম্যাজিস্ট্রেট শংকর কুমার তাকে পাঠিয়েছেন।


নাজির রানা আরও জানান, 'গাড়িটির ভেতরে রয়েছেন চট্টগ্রামের এডিশনাল জজ আলিম উদ্দিন। রাজশাহীতেই তার শ্বশুর বাড়ি।'

 
'নাজির রানা'র এ নির্দেশনার পরপরই পুলিশের আচরণ পাল্টে যায়। তারা রিকশা চালককে একপাশে নিয়ে গিয়ে দ্রুত ওই এলাকা থেকে বের করে দেয়। 


গাড়ি ছেড়ে দেয়ার জন্য জনতাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে পুলিশ। বলে গাড়ি এক্খনি ছেড়ে দিতে হবে। 


সিনিয়র সাংবাদিক আনোয়ার হক গাড়ির ভেতরে বসা 'জজ আলিম'-এর সঙ্গে কথা বলতে চান। কিন্ত প্রথমে তিনি গাড়ি থেকে নামতে রাজি হন নি।


পরে মাত্র মিনিট খানেকের জন্য বাইরে এলে সাংবাদিক আনোয়ার হক বলেন, আপনার বেপরোয়া চালকের কারণে আমি তো মারাই যাচ্ছিলাম।

 

উত্তরে সেই বিচারক তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সুরে ঘাড় ঝাঁকিয়ে দম্ভ দেখিয়ে বলেন, 'এক্সিডেন্ট হতেই পারে। আর আপনি তো আর মরেন নি'!
 
বলেই তিনি গাড়িতে উঠেই চালককে গাড়ি স্টার্ট দিতে বলেন। পুলিশের সহায়তায় দ্রুত ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়ে যায় বিচারকের ওই মাইক্রোবাস।